ফেনীতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবসে মানববন্ধন-সমাবেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
| প্রিন্ট সংস্করণ | ফটো কার্ড
 ছবি:
ছবি:

ফেনীতো গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবসে মানববন্ধন ও সমাবেশের আয়োজন করেছে মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ফেনী ইউনিট। রোববার দুপুরে ফেনী প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে মানববন্ধনে গুমের স্বীকার ব্যক্তিদের স্বজন ও মানবাধিকার সংগঠকরা উপস্থিত ছিলেন। 

এর আগে ফেনী প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অধিকার ফেনী ইউনিটের আয়োজনে সমাবেশের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন গুমের শিকার মাহবুবুর রহমান রিপনের মা রওশন আরা বেগম। ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এ কে এম আব্দুর রহিমের সভাপতিত্বে অতিথির বক্তব্য রাখেন ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি রবিউল হক রবি, মুহাম্মদ আবু তাহের ভূঁইয়া, সাপ্তাহিক আনন্দ তারকা'র সম্পাদক এম মামুনুর রশিদ, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় মহাসচিব মহিউদ্দিন খন্দকার, লায়ন্স ক্লাব অব ফেনীর প্রেসিডেন্ট লায়ন জাফর উল্লাহ।

অধিকার ফেনী ইউনিটের ফোকাল পার্সন সাংবাদিক নাজমুল হক শামীমের সঞ্চালনায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকার ফেনী ইউনিটের সদস্য জাফর আহমদ ভূঁইয়া। 
বক্তব্য রাখেন সাপ্তাহিক স্বদেশপত্র সম্পাদক এন এন জীবন, দৈনিক অজেয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক শাহজালাল ভূঁইয়া, এনজিও ফেয়ার এর প্রতিষ্ঠাতা কাজী সালাউদ্দিন নোমান, ক্রিয়া সংগঠক ইমন উল হক, আমার বাংলাদেশ (এবি) যুব পার্টি'র সদস্য সচিব ইব্রাহিম সোহাগ, ফেনী জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহমদুল হক খোকন প্রমুখ। 

সভায় গুম হওয়া যুবদল নেতা মাবুবুর রহমান রিপনের মা রৌশন আরা পরিবারের কাছে তার ছেলেকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘১২ বছর আগে ২০১৪ সালে আমার ছেলে যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনকে আইনশৃঙ্খরা বাহিনীর পরিচয়ে (র‍্যাব) তুলে নিয়ে যায়। যার পেছনে আওয়ামী লীগের ফেনীর এক প্রভাবশালী নেতা জড়িত। রিপন গুম হওয়ার পর আজও তাঁর হসিদ পায়নি। মামলা নেয়নি থানা পুলিশ। আমার মত অভাগা মা গুমের শিকার হওয়া ছেলের বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ১২ বছরও মেলেনি বিচার। এই অন্তবর্তীকালীন সরকার আমার ছেলের গুমের বিচার করবে আমি সেই প্রত্যাশা করি। রিপনের মত আর কোন ব্যাক্তি যেন গুমের শিকার না হয় সেজন্য রাষ্ট্রকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

মানববন্ধন ও সমাবেশে গুমের শিকার হওয়া যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমান রিপনের বড় ভাই মাহফুজুর রহমান সোহাগ, রিপনের চাচা ওয়াহিদুর রহমান, মাসিক মৌলিক পত্রিকার সম্পাদক নুরুল আফসার, সাপ্তাহিক ফেনী সংবাদ'র নির্বাহী সম্পাদক মোস্তফা মুহিত, গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী নসু, মানবাধিকার সংগঠক মোস্তফা কামাল বুলবুল, আমিনুল ইসলাম শাহীন, মো. শহিদুল ইসলাম মিশু, সংগঠক রাসেল চৌধুরসহ সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। 

অধিকার তাদের প্রতিবেদনে বলেন, ৩০ অগাস্ট গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর 'গুম হওয়া থেকে সমস্ত ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ'টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়। 

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদি সরকার সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে গুমকে ব্যবহার করে। এই সময়ে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বীসহ সাধারণ নাগরিকরা গুম, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। গোপন বন্দিশালাগুলোতে ফ্যাসিবাদি ব্যবস্থার বিরোধীতাকারী এবং ভারতের স্বার্থের বিপক্ষে মূলত যাঁরা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হতেন তাঁদের গুম করে নির্যাতন করা হতো।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদি হাসিনা সরকারের পতন হয়। ৮ অগাস্ট ২০২৪ এ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর ২৯ অগাস্ট গুম হতে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বাংলাদেশ অনুমোদন করে। এই সনদ অনুমোদনের ফলে গুমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইন প্রণয়নের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় এবং অর্ন্তবর্তী সরকার 'গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫' জারি করে। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংসদে পাশ না করায় অধ্যাদেশটি বাতিল হয়ে যায়।

গত ৩ অগাস্ট মন্ত্রীসভা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ অনুমোদন করেছে। মন্ত্রীসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল পুলিশকে। গত ২৭অগাস্ট এই খসড়া আইনের কিছুটা পরিবর্তন করে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়। এই আইনের ১৪(৩) ধারায় বলা হয়েছে শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনী পরিচালনা করতে পারবে না এবং উক্ত ক্ষেত্রে সরকার উক্ত অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত বাহিনী ব্যতিরেকে অন্য কোনো বাহিনী বা আন্ত: বাহিনীর তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করতে পারবে। কিন্তু এটি বাস্তবায়ন যোগ্য নয়। কারণ পুলিশসহ যেকোনো শৃঙ্খলা বহিনী কর্তৃক গুমের তদন্ত পক্ষপাতদুষ্ট হবে। বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সরকার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ইতিহাস রয়েছে এবং তাদের তদন্ত প্রায়শই: পক্ষপাতদুষ্ট বলে প্রতিভাত হয়েছে। অধিকার এবং গুম সংক্রান্ত ইনকোয়ারি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী দেখা গেছে গুমের ক্ষেত্রে এক বাহিনী আরেক বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে যেত। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের আগে কোন বাহিনী গুম করেছে সেটা কখনোই জানা সম্ভব হয় না।

অন্যদিকে এই আইনের ২১ ধারা অনুযায়ী তদন্তের মধ্য দিয়ে অভিযোগটি আদালতে মিথ্যা বিবেচিত হলে অভিযোগকারীর ৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। ফলে তা বিচারহীনতার পথকে আরো প্রশস্ত করবে এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে গুমের অভিযোগ দায়ের করতে নিরুৎসাহিত হবে। উল্লেখ্য, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫ এ এই ধরনের মামলার তদন্তের দায়িত্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। গুমসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত করার ক্ষমতা স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে দিতে হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুমের ঘটনা ঘটেছে, যা গুমের শিকার ব্যক্তি, পরিবার এবং মানবাধিকার কর্মীদের যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ ঘটিয়েছে।

সরকারের কাছে অধিকার নিম্নলিখিত দাবীগুলো জানাচ্ছে-
১. গুমের অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর তদন্তভার দিতে হবে এবং তা আইনে উল্লেখ করতে হবে।

২. গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনও ফিরে আসেনি, তাঁদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন সে ব্যবস্থা করতে হবে।

৩. যে সমস্ত ব্যক্তি গুমের পর ফেরত এসেছেন, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এমনকি কাউকে কাউকে মিথ্যা সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বা নির্যাতন করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে নিম্ন আদালতকে ব্যবহার করে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। এই সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

বিষয়:

এলাকার খবর

সম্পর্কিত